জোর পূর্বক বেতন আটকে রাখলো দীর্ঘ ১১ মাস

মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে কাগতিয়া মাদ্রাসার ২৫ শিক্ষক

 সিটিজেন নিউজ ডেস্ক
আপডেট: ২০২০-০৬-০৭ , ০২:৩০ পিএম

মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে কাগতিয়া মাদ্রাসার ২৫ শিক্ষক ছবি: সিটিজেন নিউজ

দীর্ঘ ১১ মাস ধরে বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে চট্টগ্রাম রাউজানের কাগতিয়া এশাতুল উলুম কামিল এম. এ. মাদ্রাসার ২৫ জন শিক্ষক। বর্তমানে (কোভিড-১৯) করোনাভাইরাসের কারণে এসব শিক্ষকদের জীবন পরিবার নিয়ে আরও দুর্বিসহ হয়ে উঠছে। বেতন পরিশোধের জন্য সরকারের মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা থাকা স্বত্বেও মনগড়া আইন দেখিয়ে বেতন আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে জনতা ব্যাংক ম্যানাজার (গহিরা শাখা) মো. সোয়ায়েব হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে।

জানা যায়, ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামের রাউজানে কাগতিয়া এশাতুল উলুম কামিল এম. এ. মাদ্রাসাটি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। পরে ১৯৮২ সালে পহেলা জানুয়ারিতে সরকার ওই মাদ্রাসার শিক্ষকদের মান্থলি পেমেন্ট অর্ডারর (এমপিও) আওতায় নেয়। দীর্ঘ সময় ওই মাদ্রাসার শিক্ষকরা শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে আসলেও গত ১১ মাস যাবত তাদের বেতন-ভাতা জনতা ব্যাংকের গহিরা শাখার ম্যানাজার মো. সোয়ায়েব হোসেন চৌধুরী অবৈধ ক্ষমতায় আটকে রেখেছেন বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা।

তবে কী কারণে ওই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা আটকে রাখা হয়েছে; সিটিজেন নিউজের এমন প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনও জবাব দিতে পারেনি জনতা ব্যাংকের গহিরা শাখার ম্যানাজার মো. সোয়ায়েব হোসেন চৌধুরী।

সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জুন মাসে ওই মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতনের বিল গহিরা শাখার ব্যাংকে জামাদান করতে গেলে ব্যাংক কতৃপক্ষ সেটা গ্রহনে অস্বীকৃতি জানালেও পরে সেটি গ্রহন করে। গ্রহনের সময় থেকে শিক্ষদের বেতন পরিশোধ না করে কয়েকমাস পর সোয়ায়েব হোসেন চৌধুরী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের প্রত্যয়ন পত্র চান ওই শিক্ষকদের কাছে।

পরে ওই শিক্ষকরা দীর্ঘ সময় তাদের বেতন-ভাতা উত্তোলন করতে না পেরে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ঢাকা বরাবর একটি আবেদন করেন। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের চলতি বছরের ২ জানুয়ারি এক চিঠিতে বলা হয়েছে, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের প্রত্যয়ন প্রয়োজন-এরকম কোনও নির্দেশনা নেই এবং ব্যাংক কতৃপক্ষ বেতন বিলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের প্রত্যয়ন চেয়েছেন যা সূত্রোক্ত ১ ও ২ নং স্মারকের পরিপন্থী বলে প্রতিয়মান হয় বলে উল্লেখ করা হয়।

৫৭.২৫.০০০০.০০২.১৭.০১৮.১৮-০৩ নং স্বারকের ওই চিঠিতে জনতা ব্যাংক- লোকাল শাখা, ঢাকা, যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও অর্থ)- কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, একান্ত সচিব- কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, ম্যানাজার- জনতা ব্যাংক, গহিরা শাখা বরাবরে বলা হয়েছে রাউজানে কাগতিয়া এশাতুল উলুম কামিল এম. এ. মাদ্রাসার শিক্ষদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য।

চিঠিতে আরও বলা হয়, রাউজানে কাগতিয়া এশাতুল উলুম কামিল এম. এ. মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারিদের অনুকুলে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের বেতন-ভাতার সরকারি অংশের টাকা (এমপিও) এবং ২০১৯-২০২০ সালের অর্থ বছরের অন্য কোনও এমপিও অনুত্তোলিত থাকলে তা পরিশোধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হইলো।

কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এমন নির্দেশনার পরও জনতা ব্যাংকের গহিরা শাখার ম্যানাজার মো. সোয়ায়েব হোসেন চৌধুরী মনগড়া আইনে ওই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে।

রাউজান উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার তৌহিদ তালুকদার সিটিজেন নিউজকে জানান, ব্যাংক ম্যানাজার যে বিষয়টি উত্থাপন করে শিক্ষকদের কাছে আমার প্রত্যয়ন চেয়েছেন সেটির কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই। এ বিষয়ে আমি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের ওই চিঠির জবাব দিয়েছি চলতি বছরের জানুয়ারির ৯ তারিখে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাগতিয়া এশাতুল উলুম কামিল এম. এ. মাদ্রাসার একজন শিক্ষক সিটিজেন নিউজকে জানান, ‘আমরা দীর্ঘ ১১ মাস ২৫ জন শিক্ষক বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছি। বেতন-ভাতা উত্তোলনের জন্য জনতা ব্যাংক গহিরা শাখার ম্যানাজারের কাছে তিনি তার হাত-পা বাঁধা বলে আমাদের বেতন-ভাতা পরিশোধে অস্বীকৃতি জানায়।’

তিনি বলেন, ব্যাংক ম্যানাজার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের যে প্রত্যয়নের কথা বলছে সেটার কোনও বৈধতা বা প্রয়োজন নেই বলে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে। তারপরও আমাদের বেতন-ভাতা অবৈধভাবে আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের গহিরা শাখার ম্যানাজার মো.সোয়ায়েব হোসেন চৌধুরী সিটিজেন নিউজকে বলেন, আমি এ বিষয়ে কোনও কথা বলতে রাজি না।

তিনি সিটিজেন নিউজের সাথে কথা বলতে রাজি না হলেও গত দুমাস আগে ওই মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক ফোরকান মিয়ার সাথে গহিরা ব্যাংক ম্যানাজার মো. সোয়ায়েব হোসেন চৌধুরীর একটি ফোনালাপ সিটিজেন নিউজের হাতে আসে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা কার নির্দেশে পরিশোধ করছেন না-সভাপতির এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যাংক ম্যানাজার সোয়ায়েব হোসেন সভাপতিকে বলছেন আমার হাত-পা বাঁধা। দীর্ঘ ৮ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের ওই ফোনালাপের শেষে ব্যাংক ম্যানাজার সোয়ায়েব হোসেন চৌধুরী সভাপতিকে আপনি আমাকে মাফ করেন-এমন কথাও বলেন।

জনতা ব্যাংক লোকাল শাখা-ঢাকার এসইও সুরভী সিং এ বিষয়ে সিটিজেন নিউজকে বলেন, ওই মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা গহিরা ব্যাংকে জমা রয়েছে। যে কোনও সময় তারা বেতন উত্তোলন করে নিতে পারেন। এক প্রশ্নের জবাবে সুরভী সিং বলেন, কাগজপত্রে যদি কোনও ক্রটি থাকে তাহলে এটা দেখার দায়িত্ব ওই শাখার (গহিরা) ব্যাংক ম্যানাজারের।

তিনি বলেন, সব কাজগপত্র ঠিক থাকার পরও যদি ব্যাংক ম্যানাজার শিক্ষদের বিল পরিশোধ না করেন তাহলে যথাযথ কতৃপক্ষ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন।

জনতা ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার জিএম আইসোলেশনে থাকায় তার কোনও বক্তব্য নেয়া সম্ভব না হলেও ডিজিএম সরওয়ার কামাল সিটিজেন নিউজকে বলেন, ওই মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য বিধি মোতাবেক বলা হয়েছে। কিন্তু তারপরও কেন বেতন পরিশোধ করা হচ্ছে না এ বিষয়ে জিএম সাহেবের সাথে কথা বলার জন্য অনুরোধ করেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে কথা হলে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (অর্থ-ডিজি) মো. শামসুজ্জামান সিটিজেন নিউজকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে মাদ্রাসার শিক্ষকরা মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর বরাবরে একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো।

করোনা ইস্যুতে মানুষ এখন অর্থ সঙ্কটসহ দু:সময় আছে। এমন সময়ের ব্যাংক ম্যানাজার ওই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এখনও কেন পরিশোধ করেননি সে সম্পর্কে শিক্ষকরা আমাদের আর জানায়নি।

মো. শামসুজ্জামান সিটিজেন নিউজকে বলেন, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে  প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।