কেওক্রাডং বিজয়ের গল্প (পর্ব ০২)

 এস. এম. মশিউর রহমান
আপডেট: ২০২০-১০-৩১ , ০১:২৩ পিএম

কেওক্রাডং বিজয়ের গল্প (পর্ব ০২) ছবি: সিটিজেন নিউজ

আমাদের মোট দশজনের দল। হাঁটা শুরু করতেই মনে হলো দু'পাশের সবুজ পাহাড়ি পরিবেশ যেন জাদু দিয়ে আমাদের আটকে রাখতে চায়। কিন্তু আমরা সে জাদুর মায়া ত্যাগ করে সামনে এগুচ্ছি। লক্ষ্য বাংলাদেশের এক সময়ের সর্বোচ্চ চূড়া বিজয়। তিন-চারটা পাহাড় বেয়ে উঠতেই ইতিমধ্যে আমাদের মাঝে ক্লান্তি এসে ভর করা শুরু করেছে। আমাদের গাইড আলমগীর ভাই একটু জিড়িয়ে নিতে বললেন। তার যুক্তিতে, দশ মিনিটের একটা বিরতি নিলে শরীরে শক্তি ফিরে আসে। বিরতি শেষে আবার শুরু হলো আমাদের যাত্রা। 

লতা ঝর্ণার কাছে একটু থেমে আবার চলা শুরু। একের পর এক খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে উঠতে এবার একটু দূর থেকে ঝর্ণার আওয়াজ পাওয়া গেল। উঁচু-নিচু, পিচ্ছিল পাথরের অনকটা পথ পেরিয়ে এবার আমরা চিংড়ি ঝর্ণার সামনে। হাজার বছরের পুরনো অনেকগুলো পাথরের গা বেয়ে বেশ উঁচুতে উঠে ঝর্ণার ঠান্ডা পানি গায়ে লাগতেই গা শিহরিত হয়ে উঠলো। এতটা ক্লান্তির পর এরকম ঝর্ণার ঠান্ডা পানিতে গোসল সত্যিই এক অসাধারণ অনুভূতি। ভিজে, নেচে গেয়ে ক্লান্তির অবসাদ কাটিয়ে আবারও আমরা রওয়ানা দিলাম। 

পথে পথে দু'একজন উপজাতি বসে শরবত, কলা, পেয়ারা ও পাহাড়ি ফল বিক্রি করছেন। চলার ফাঁকে ফাঁকে আমরা শরবত ও ফল খেয়ে গায়ে শক্তি আনার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পাহাড়ি দুর্গম পথ সে কৌশল থোরাই কেয়ার করে। নিজের সাথে নিজের প্রতিনিয়ত বোঝাপড়া করে চলতে হয় এ পথে। আমাদের মত সমতল ভূমির মানুষদের যখন নাভিশ্বাস উঠার যোগাড়, তখন দেখি উপজাতি মানুষ দেদারসে উঠানামা করছে। তাও আবার মাথায় ভারী এক বোঝা নিয়ে। 

বলতে বলতে চলে আসলাম রুনতন পাড়া ভিউ পয়েন্টে। এক লক্ষ তেইশ হাজার পাঁচশত বত্রিশ টাকা খরচ করে, লোকাল গভর্ন্যান্স সাপোর্ট প্রজেক্ট - ৩ এর আওতায়, তনসিং মুরুং সুন্দর এ ভিউ পয়েন্টকে কেন্দ্র করে এখানে একটা ছোট বিশ্রামাগার তৈরী করে দিয়েছেন। 

দু-তিনজন উপজাতি ফল নিয়ে বসেছেন। কলা, ভুট্টা ও পেয়ারা জাতীয় ফলমূল। পাহাড়ি বড় একটা গাছের নিচে পর্যটকগণ বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। আসলে এতটা ক্লান্তিময় পথ পার হওয়ার পর এরকম একটু বিশ্রামের জায়গায় যে কেউ বসে পরবেন, এটাই স্বাভাবিক। 

কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমরা একটা কবরস্থান পেলাম। এক লড়াকু আদিবাসী নেতার কবর। এ জায়গা থেকেও খুব সুন্দর একটা ভিউ পাওয়া যায়। 

আশপাশের বেশকিছু পাহাড়ের গায়ে দেখলাম জুম চাষ করেছে আদিবাসীরা। আর যেখানটাতে জুম চাষ করা হয়েছে সেখানকার রং কিছুটা অন্যরকম। ধূসর সবুজ গাছগুলোকে কেটে সেখানে সমতল একটা করে ঢাল তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে, যার ফলে অন্যান্য পাহাড়ের রংয়ের সাথে জুম চাষের পাহাড়ের সুস্পষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। মনে হয়, কোন এক মহান চিত্র শিল্পী তার নিপুণ হাতে পরম যত্ন নিয়ে এ পাহাড়কে সাজিয়েছেন। রাস্তার ঠিক পাশেই দেখা মিললো একজন জুম চাষীর। উনি তার আদাক্ষেতের পরিচর্যা করছিলেন। তার নাম খ্রেয়া বোম। খ্রেয়া জানালেন, তারা শুধু আদা নয় হলুদের চাষও করছে ইদানিং। আর  খ্রেয়ার যে আদাক্ষেত তার অনেক নিচে পাহাড়ের দুটি সাড়ি প্রায় একই উচ্চতায় চলে গেছে বহুদুর। 

বেলা তখন প্রায় বারোটা। ততক্ষণে আমরা দার্জিলিং পাড়ায়। হাতের বামে একটা দোকান পাওয়া গেল। প্রচন্ড ক্ষুধার্ত আমরা দোকানের বিস্কুটগুলো পাল্লা দিয়ে সাবার করতে লাগলাম। ক্ষুধা নিবারণের মোটামুটি সব আয়োজনই আছে এখানে। আমরা স্যালাইন, কেক ও কলা খেয়ে আবারও শক্তি সঞ্চয় করলাম।

ছোট ছোট অনেকগুলো ঘর, একটা দোকান নিয়ে গঠিত এ পাড়া। মূলত দার্জিলিংয়ের মত দেখতে ও ওখানকার মত ঠান্ডা পড়ায় এ জায়গার এরকম নামকরণ। গাইড আলমগীর ভাইয়ের মতে, প্রায়ই মেঘে পুরো ঢেকে যায় এ পাড়া। বেশ ছিমছাম, গোছানো, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটি পাড়া। প্রতিটি বাড়ি সুন্দর ফুলের বাগানে সাজানো। 

একটি গির্জার পাশেই শোভা পাচ্ছে বোমরাম গোসপেল সেনেটারি, যিনি (১৯১৮-২০১৮) প্রায় একশত বছর জীবিত ছিলেন। এ পাড়া গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণে তাঁর অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন এখানকার বাসিন্দারা। একজন আদিবাসীকে দেখলাম হাতে বাঁশের বেত দিয়ে চালনি বুনছেন।

আকাশের নীল রংটা বেশ নজড়ে আসার চেষ্টা করছে বারবার কিন্তু এ পাড়ার সৌন্দর্যের কাছে সে আবেদন নেহায়েত তুচ্ছ মনে হচ্ছে।

এখানকার বাচ্চাগুলো দেখতে এত চমৎকার যে বলার মত নয়।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্যাপটিস্ট চার্চ অব বাংলাদেশের তত্বাবধানে নির্মিত একমাত্র দার্জিলিং লোকাল চার্চটি বন্ধ থাকায় দেখার সুযোগ পেলামনা।

জানতে পারলাম, অনেক আবেদনের পর ৩ নং রেমাক্রী প্রাংসা ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ডে ২০১০ সালে নির্মিত হয়েছে "দার্জিলিংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়" যা পরে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখে জাতীয়করণ করা হয়।

বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করছে বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়, যাদের সংস্কৃতি এবং জীবন বৈচিত্র্য সরাসরি প্রকৃতির সঙ্গে জড়িত।

যতটুকু বুঝলাম, এসব এলাকায় মানুষের যাতায়াত যত বাড়ছে ততই চলাফেরায় আর জীবনযাপনের স্বাভাবিকতা ব্যাহত হচ্ছে এখানকার আদিবাসীদের। এসব আদিবাসীদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষণীয়। সমতলভূমির মানুষদের পোষাকী ঢং চলে এসেছে এদের জীবনে।

এ দার্জিলিং পাড়া থেকেই দেখা গেল কেওক্রাডং এর চুড়া। স্থানীয় এক লোকের ভাষায়, আমরা কাছাকাছি এসে গেছি প্রায়। কেওক্রাডং এর একদম পায়ের কাছেই এই দার্জিলিং পাড়া। কিন্তু গত কয়েক ঘন্টার অভিজ্ঞতা বলে, এসব কথা বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। পাহাড়কে যত কাছে দেখা যায় আসলে তা ততটাই দুরে। আর এখানকার আদিবাসীরা যেখানে যেতে ১ ঘণ্টার কথা বলে সেখানে যেতে আমাদের লাগে ৩ ঘণ্টার মতো। তারা বলে, এই তো কাছেই। আর আমাদের কাছে সে পথ যেন শেষই হতে চায় না। পরে আমরা বুঝতে পেরেছি, বেশিরভাগ আদিবাসীর কাছেই ঘড়ি থাকে না। তাই অনুমান নির্ভর সময়ের কথা বলে তারা। দার্জিলিং পাড়ায় আধা ঘন্টার মতো বিশ্রাম নিয়ে দেখা যাওয়া সেই কেওক্রাডং এর চুড়ার দিকে ওঠা শুরু করলাম।

মাথার উপরের সূর্য ততক্ষণে পশ্চিমে ঢলে পড়তে শুরু করেছে। কোন একটা জুসের বিজ্ঞাপনে দেখেছিলাম, সূর্য মাথা থেকে রস শুষে নিচ্ছে। আমাদের অবস্থাও এখন তাই। শরীরের সবটুকু রস শোষণ করতে সূর্য আর পাহাড় প্রতিযোগীতায় নেমেছে।

একটা পাহাড়ের চুড়ার একটু নিচে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আসলে দাঁড়াতে বাধ্য হলাম। দৃষ্টিসীমার একপাশে উড়ন্ত মেঘগুলো পাহাড়ের চুড়ায় এসে আছড়ে আছড়ে পড়ছে। অন্যপাশে প্রখর সূর্যের ঝলসানো আলোকচ্ছটা এসে পড়েছে পাহাড়ের গায়ে আর মেঘের ওপর। এ এক অন্যরকম সৌন্দর্য। সে সৌন্দর্য্যকে ভাষায় প্রকাশ করার কোনো শব্দ আমার কাছে নেই। আবার মনে হলো, কত সুন্দর এই দেশ, কতকিছু দেখার বাকি, বাকি কতকিছু আবিস্কারের। উঁচু উঁচু পাহাড় আর সূর্যের আলোয় ঝলসে উঠা মেঘগুলো নিচের দিকে ফেলে আমরা তখনো উর্ধ্বগামী।

অপরূপ সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে যতই সামনে এগুচ্ছি ততই আমাদের কটেজটা দৃশ্যমান হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি? পথ তো আর শেষ হচ্ছেনা! একজন ট্রেকারকে অধের্য্য করার সবরকম রসদের পসরা সাজিয়ে বসেছে এ ট্রেক। হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে সে আঙুল প্রায় লাল হয়ে গেছে। ভাবতে ভাবতে আমরা এখন উপরে। উপরে মানে অনেক উপরে। 

 

সূর্যটা প্রায় প্রায় মেঘের আড়ালে চলে যাচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে দিগন্তের ওপাড়ে রংধনু উঠা-নামা করছে। সাত রংয়ের তৈরী করা সেই স্বর্ণালি আভায় চকমক করছে বুক টানটান করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কেওক্রাডংয়ের চূড়া।

কাছাকছি এসে গেছি, বিজয়ের আনন্দ হৃদয়কে স্পর্শ করতে শুরু করেছে। আর একটু, আর একটু। এসে গেছি প্রায়। এবার সামনে দুটো পথ। একটা বাঁয়ে যেখানে আমাদের কটেজ, আর একটা ডানে যেখানে চূড়া। 

সামনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা পাকা সিড়ি দেখে অবাক হলাম। এটাই কেওক্রাডং এর চূড়ায় উঠার সর্বশেষ প্রক্রিয়া। হাতে গোনা ৬৩ টি ধাপ পেরোলেই যেখানে পৌঁছাবো সেটাই কেওক্রাডং এর চুড়া। কিন্তু মনটা এবার একটু খারাপ হয়ে গেল। সারাটা পথ এত কষ্ট করে এসে এই সিঁড়ি দিয়ে আরামে উঠতে গিয়ে মনে হলো, এই রোমাঞ্চকর যাত্রার ছন্দ অনেকটাই ব্যাহত হলো কিনা।

আমার আসলে এতকিছু ভেবে কোন লাভ নেই। কারণ এর আগে কত এ্যাডভেঞ্চারপ্রীয় মানুষ এই জায়গাটা স্পর্শ করে বিজয়ের আনন্দ পেয়েছে! কত মানুষ নিজেকে সবার ওপরে ভেবেছে! 

দুপুর প্রায় দেড়টা তখন। সেই কেওক্রাডং এর চুড়ায় আমি। সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ৩২০০ ফিট ওপরে। আমি ছাড়া আর কেউ এখনো পৌঁছায়নি। দেরী না করে সামনের হ্যালিপ্যাডের দিকে দ্রুত হাঁটা শুরু করলাম।

বাংলাদেশের একসময়ের সর্বোচ্চ চূড়া থেকে চারদিকে তাকিয়ে মনে হলো, একটা মেঘের রাজ্যে একখণ্ড মাটির উপর ভাসছি। মনে হলো, কেওক্রাডং বিজয়ের জন্য শুভেচ্ছা জানাতেই বুঝি মেঘের ভেলা ভাসানো হয়েছে চারিদিকে...

 

ক্লান্তির সর্বোচ্চ ধাপ পেরিয়ে অনেক কষ্ট করে পৌঁছেছি এই কেওক্রাডংয়ের চূড়ায়।

কেওক্রাডং নামটি এসেছে মারমা ভাষা থেকে। মারমা ভাষায় কেও মানে পাথর, ক্রা মানে পাহাড় আর ডং মানে সবচেয়ে উঁচু। অর্থাৎ কেওক্রাডং মানে সবচেয়ে উঁচু পাথরের পাহাড়।

পিছনে ব্যাগ, একহাতে ক্যামেরা আর অন্য হাতে পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে এত দীর্ঘ পথ হাঁটতে গিয়ে ঘেমে চুপচুপা হয়ে গেছি। নিঃশ্বাস পর্যন্ত ফেলতে পারছিনা।

জীবনের একটা সময় প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছিল কিন্তু অনেকদিন পর আবার সেই একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হলো। এ পথ আমায় শেখালো, জীবনে উপরে উঠতে হলে ঠিক এভাবেই পরিশ্রম করতে হবে। অনেক সাধনায় এই উচ্চতায় উঠতে পেরেছি। এবার কেওক্রাডংয়ে নিজেকে বিলিয়ে দেবার পালা। প্রকৃতির মাঝে মিলিয়ে যাবার পালা। আমি খুবই তৃষ্ণার্ত। কেওক্রাডংয়ের সবটুকু সৌন্দর্য্যের সুধা পান করে সে তৃষ্ণা নিবারণ করতে চাই। আজ সারাদিন, সারারাত ও আগামীকাল সকাল সাতটা পর্যন্ত প্রতিটা সেকেন্ড হিসেব করে করে এই সব স্মৃতি মেমোরি কার্ডে জমা করবো। বিলিন হওয়ার আগেই এই স্মৃতিকে নিজের মস্তিস্কে এমনভাবে সেট করতে চাই যেন মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তা মনে থাকে।